ডিপি বাংলা নিউজ ডেক্স: ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উদযাপন ও নবী প্রেমিক রা এইদিনে কেন জুলুস করে তা ডিপি বাংলা নিউজের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানানোর চেষ্টা করবো।প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – এর প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ করা ইমানের পূর্বশর্ত। এটি আল্লাহর মহব্বত ও ভালোবাসা প্রাপ্তির একমাত্র মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ ইমানদার হবে না যতক্ষণ তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সব মানুষের চেয়ে আপন আর বেশি প্রিয় না হয়।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ তোমাদের নিয়ামত দান করেন ,সেজন্য তোমরা তাঁকে ভালোবাসবে আর তাঁর মহব্বত পাওয়ার জন্য তোমরা আমাকে ভালোবাসবে। নবীজি সম্পর্কে আল্লাহর হুকুম কী, সেই জ্ঞান অর্জন করে সেভাবে ইবাদত করতে হবে। মহান রাব্বুল আলামিন নবীজির শান বুলন্দ করে বলেন- হে মাহবুব! আপনি বলে দিন, ‘হে মানব জাতি, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমার অনুসারী হয়ে যাও, (ফলে) আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ্ ক্ষমা করবেন । নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) এর ইত্তিবা ও সর্বাঙ্গীণ অনুসরণ আমাদের কর্তব্য। আল্লাহ কোরআন মাজিদে উল্লেখ করেছেন, ‘বলুন তোমরা যদি আল্লাহকে মহব্বত করে থাকো তাহলে তোমরা আমার ইত্তিবা ও অনুসরণ কর তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মহাক্ষমাশীল ও অপার দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান আায়াত: ৩১)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসুলের আনুগত্য কর তাহলে তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে। (সূরা আলে ইমরান আয়াত : ১৩২)।প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম.)-এর অনুপম আদর্শ অনুসরণ করা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই রসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য। (সূরা আহজাব আয়াত : ২১)।
***আসুন আমরা জেনে আছি ঈদে মিলাদুন্নবী কি?
ঈদে মিলাদুন্নবী হলো ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল হযরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) এর আগমন উপলক্ষে মুসলিমদের মাঝে পালিত এক আনন্দ উৎসব। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ ই রবিউল আউয়াল হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রায় সব জায়গায় ১২ রবিউল আউয়াল হিজরিতেই ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
ঈদ অর্থ হচ্ছে খুশি বা আনন্দ প্রকাশ করা। আর মিলাদ ও নবী দুটি শব্দ একত্রে মিলিয়ে মিলাদুন্নবী বলা হয়। আর নবী শব্দ দ্বারা রাহমাতুলি্লল আলামিন হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) কে বোঝানো হয়েছে। এককথায়, ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ হুজুর পাক (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) এর পবিত্র ‘বেলাদত শরিফ’ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা।
‘মিলাদ’ বা ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে শুধুমাত্র নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম .)-এর জন্মের সময়ের আলোচনা, জীবনী পাঠ, তাঁর বাণী, তাঁর শরিয়ত বা তাঁর হাদিস আলোচনা, তাঁর আকৃতি-প্রকৃতি আলোচনা, তাঁর উপর একাকী বা সম্মিলিতভাবে দরুদ শরীফ পাঠ, সালাম পাঠ, কিয়াম ইত্যাদি বুঝায়। আল-কুরআনে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম .) মহান আল্লাহ পাকের বিশেষ কোন রহমত ও নিয়ামত দানের দিনকে ঈদরূপে পালন করার সুস্পষ্ট প্রমাণ( আল-কুরআন)। বাংলাদেশে এই দিনটাকে মিলাদুন্নবী হিসেবে বলা হলেও অন্যান্য জায়গায় অন্যান্য নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম গন এই দিনটাকে নবী দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমন উপলক্ষে আল্লাহর শুকরিয়ার্থে শরীয়ত সম্মতভাবে খুশি উদযাপন করাই হলো ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
পবিত্র ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বিশ্বের ঈমানি প্রেরনার জয় ধ্বনী নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে আসে রবিউল আওয়াল মাসে। পবিত্র ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্যতম উৎসব।
কোন নেয়ামত ও রহমত লাভ করলেই আনন্দোৎসব করা যেরূপ মানুষের স্বভাবজাত কাজ তদ্রূপ আল্লাহ তাআলার নির্দেশও তাই। যেমন কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে : ‘(হে রাসূল!) বল : আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।’ (সূরা ইউনুছ :আয়াত ৫৮)।
আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহমাতুল্লাহ আলাইহি.) আদ্দুররুল মানসুর তাফসীরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু .)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু.) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন : ‘এখানে ‘আল্লাহর অনুগ্রহ’ বলতে ইল্ম বুঝানো হয়েছে। আর ‘রহমত’ দ্বারা বুঝানো হয়েছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আমিতো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া :আয়াত ১০৭)।
অর্থাৎ তোমরা মহামূল্যবান সম্পদ আল-কুরআন ও ইসলাম বা রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পেয়েছ। এর জন্য আনন্দ করা তোমাদের অন্যতম কাজ। যদি কুরআন মজীদ ও দীন ইসলাম পাওয়ার কারণে আনন্দ করতে হয় তাহলে যার মাধ্যমে কুরআন ও দীন পেয়েছি, যিনি ছিলেন সমগ্র জগতের রহমত, তাঁর আগমন যে কত বড় নেয়ামত ও রহমত তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না।
আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহ.) তাইতো তাঁর রচিত ‘মা সাবাতা মিনাস সুন্নাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘হাজার মাসের চেয়ে উত্তম লাইলাতুল কাদর, ফজিলতের রাত্রি শবে বরাত, শবে মেরাজ, দুই ঈদের রাত এ সবই রাহমাতুল্লিল আলামীনকে দান করা হয়েছে। যাঁকে দান করা রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, স্বয়ং তাঁর আগমন দিবস যে কত লক্ষ-কোটি দিবস-রজনীর চেয়ে উত্তম তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।’
সামান্য জাগতিক নেয়ামত লাভ করলেও তার জন্য ঈদ উৎসব করার সরাসরি উদাহরণ আমরা আল-কুরআনে দেখতে পাই। যেমন আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ কামনা করে হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম.) যে দোয়া করেছিলেন তা প্রণিধানযোগ্য। এরশাদ হয়েছে : ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম বলল : হে আল্লাহ! আমাদের প্রভু! আমাদের জন্য ঊর্ধজগৎ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন। এ হবে আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের জন্য ঈদস্বরূপ, আর আপনার অন্যতম নিদর্শন।’ (সূরা মায়িদা আয়াত : ১১৪)। ঈসা ইবনে মারইয়াম বলল : হে আল্লাহ! আমাদের প্রভু! আমাদের জন্য ঊর্ধজগৎ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন। এ হবে আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের জন্য ঈদস্বরূপ, আর আপনার অন্যতম নিদর্শন।’ (সূরা মায়িদা : আয়াত ১১৪)
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে খাঞ্চা ভরা খাওয়া পেলে তা যদি হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম.)-এর ভাষায় সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আনন্দোৎসবের কারণ ও আল্লাহ তাআলার নিদর্শন হয় তাহলে সৃষ্টির সেরা মানব, রহমতের ভাণ্ডার রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম.)-এর মতো এ মহান নেয়ামতের আগমন দিবস কতই না মর্যাদাবান, গুরুত্ববহ, কতই না আনন্দের তা সহজেই অনুমেয়।
হযরত ইমাম বুখারী (রহমাতুল্লাহ আলাইহি .) বর্ণনা করেন : ‘আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তার বংশের একজন স্বপ্নে তাকে খুবই খারাপ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করল, আপনার অবস্থা কি? সে জবাবে বলল, তোমাদেরকে ছেড়ে আসার পর আমার কল্যাণজনক কিছুই হয়নি, হ্যাঁ, এই আঙ্গুল (শাহাদাত অঙ্গুলি) দ্বারা পানি পাই। কারণ, এ আঙ্গুলের ইশারায় আমি দাসী সুয়াইবাকে মুক্তি দিয়েছিলাম।’
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহমাতুল্লাহ আলাইহি .) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ফাতহুল বারী এবং আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী (রহমাতুল্লাহ আলাইহি .) তাঁর রচিত ‘আইনী’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন : ইমাম সুহাইলী (রহমাতুল্লাহ আলাইহি .) উল্লেখ করেন যে, হযরত আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু.) বলেন, ‘আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর তাকে স্বপ্নে দেখি যে, অত্যন্ত দুরবস্থার মাঝে পতিত রয়েছে। সে বলল, ‘তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পর আমি শান্তির মুখ দেখিনি। তবে প্রতি সোমবার আমার আযাব লাঘব করা হয়।’ হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন : ‘তার এ আযাব লাঘবের কারণ হলো রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম.)-এর জন্মদিন ছিল সোমবার। তাঁর জন্মের সুসংবাদ নিয়ে আসায় দাসী সুয়াইবাকে সে খুশিতে মুক্তি দেয়। (ফাতহুল বারী, ৯ম খন্ড পৃষ্টা. ১১৮; আইনী, ২০/৯৫)।
যে কাফের সম্পর্কে কুরআন মজীদে সরাসরি নাযিল হয়েছে :
ধ্বংস হয়েছে আবু লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও।’ সে যদি একজন কাফের হওয়া সত্ত্বেও ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম.)-এর খুশির কারণে তার প্রতি সোমবার আযাব লাঘব হয়, শাহাদাত অঙ্গুলি দিয়ে পানি বের হয়- যা খেয়ে সে তৃপ্ত হয়, একজন মুসলমান ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম .) উদযাপন ও আনন্দানুষ্ঠান করলে তাতে রহমত, বরকত লাভ এবং আযাব থেকে মুক্তিলাভের এক বিরাট সুযোগ তা যে কোন বিবেকবান ব্যক্তি সহজেই অনুধাবন করতে পারে।
বাংলাদেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম .) উদযাপন করেন। মসজিদে মসজিদে, নিজ নিজ বাসায় কোরআন খতম ও জিকির আজগারের মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিন এবং মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশেষ রহমত কামনা করেন মুসলমান ভাই-বোনেরা।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃখক বাণী দিয়ে থাকেন। এদিন তারা দেশবাসীসহ বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ’র প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং মোবারকবাদ জানিয়ে থাকেন।
ঈদে মিলাদুন্নবীতে পত্রিকাগুলো ক্রোড়পত্র প্রকাশের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। টেলিভিশন ও রেডিওতে দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে।
বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
পরিশেষে , মিলাদুন্নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাসে আমরা আমাদের নবীপ্রেমকে শাণিত করি, মহান আল্লাহর দরবারে লাখো কোটিবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করি এবং প্রিয় নবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম .)-এর অনুসরণে জীবনযাপন করে ইহকালীন-পরকালীন কামিয়াবি অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দিন আমিন।

Reporter Name 









